নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে এক অভিনব ও সুপরিকল্পিত হ্যাকিং চক্রের মূল হোতা ওহিদুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের গতিবিধি সার্বক্ষণিকভাবে নজরদারি করতে তিনি যে ধরনের অত্যাধুনিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা রীতিমতো চমকপ্রদ। পুলিশি অভিযানের হাত থেকে বাঁচতে প্রধান সড়ক থেকে নিজ বাড়ি পর্যন্ত অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন ৩২ বছর বয়সী এই যুবক, যাতে পুলিশ প্রধান সড়ক দিয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তিনি সতর্ক হতে পারেন এবং দ্রুত পালানোর পথ খুঁজে নিতে পারেন।
গ্রেপ্তারকৃত ওহিদুল মোল্লা লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের রব্বেল মোল্লার ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওহিদুল নিজেকে এই এলাকার হ্যাকিং জগতের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম তাকে এই অঞ্চলের 'হ্যাকার সম্রাট' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওসি জানান, বিলমাড়িয়া গ্রামটি ইমো হ্যাকিং চক্রের এক ধরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং ওহিদুল ছিলেন সেই চক্রের মূল কারিগর। তার অধীনে এলাকায় কয়েক শ হ্যাকার সক্রিয় ছিল, যারা তাকে তাদের 'গুরু' হিসেবে মানত এবং তার নির্দেশনায় কার্যক্রম পরিচালনা করত।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ওহিদুলের রহস্যময় ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের কথা। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি তার প্রাচীরঘেরা পাকা বাড়ির একটি কক্ষে কয়েক শ কবুতর রাখার বাসা তৈরি করেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো এটি কেবল একটি সাধারণ কবুতরের খামার, কিন্তু সেই খামারের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তার গোপন আস্তানা। কবুতরের ঘরের ভেতরেই তিনি তৈরি করেছিলেন একটি আরামদায়ক বিছানা এবং বসিয়েছিলেন শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিসিটিভি মনিটরসহ দামি সব আসবাবপত্র। এই গোপন কক্ষ থেকেই তিনি অত্যন্ত গোপনে অন্যের মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ নিতেন এবং বিভিন্ন সাইবার অপরাধ ও হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
পুলিশি অভিযানের সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন অপারেটরের মোট ৬৮টি সিম কার্ড। এই বিপুল সংখ্যক সিম তিনি মাত্র ৭টি মুঠোফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করতেন। সিমগুলোর হিসাব নিখুঁতভাবে রাখার জন্য তিনি একটি সাদা কাগজে ছক করে বিস্তারিত লিখে রেখেছিলেন। কোন নম্বরটি বিকাশ অ্যাকাউন্টের জন্য এবং কোনটি নগদের জন্য, তা সহজে বোঝার জন্য তিনি বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করতেন। যাতায়াতের জন্য তিনি দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন, যা তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল সোমবার দিবাগত গভীর রাতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনায় লালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল মাসুম বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ওহিদুল মোল্লা ছাড়াও তার সাথে জড়িত আরও পাঁচ সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
















