রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শহীদ ওমরাহযাত্রী মুফতি নাসরুল্লাহ বদরের শেষ মুহূর্তের আবেগঘন বার্তা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে ফিরছে। শাহাদাতের ঠিক আগ মুহূর্তে আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি যে অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, তা হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে সবাইকে। রোববার ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্রুসিক্ত পোস্টে এই শোক ও অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শহীদ হন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষাসচিব মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ বদর। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ওমরাহ কাফেলার সদস্য হিসেবে সৌদি আরব সফরে গিয়ে তিনি এই মর্মান্তিক হামলার শিকার হন। শাহাদাতের কিছু সময় আগে তিনি ফেসবুকে ছবি ও আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের অন্তিম অনুভূতি শেয়ার করেছিলেন। গত ১০ অক্টোবর শনিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে দেশ ছাড়ার প্রাক্কালে বিমানে ওঠার ছবি দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, গুডবাই প্রিয় বাংলাদেশ। প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে যাচ্ছি, হৃদয়ে অগণিত স্মৃতি আর একরাশ আবেগ নিয়ে। গন্তব্য এবার পবিত্র হারামাইনের পুণ্যভূমি। আল্লাহ চাইলে আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। এরপর আকাশপথে ৩১ হাজার ৮৪৬ ফুট উচ্চতায় রিয়াদ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে বসে তিনি লেখেন, স্বপ্নের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি। আকাশের অসীম নীলিমায় উড়ে চলেছি স্বপ্নের গন্তব্যের পানে। জীবনের সেরা সফরের এই মুহূর্তগুলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। জানালার ওপাশে বিস্তীর্ণ আকাশ, হৃদয়জুড়ে আনন্দ আর অন্তরে বাইতুল্লাহ জিয়ারতের গভীর আকাঙ্ক্ষা। প্রতিটি মুহূর্ত যেন স্মৃতির পাতায় চিরদিনের জন্য লিখে রাখার মতো।
আলহামদুলিল্লাহ, আর মাত্র এক ঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরেই পৌঁছে যাব সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। এরপর শুরু হবে হৃদয়ের আরও কাছের স্বপ্নময় গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলা। সঙ্গে তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাদের সফর সহজ করুন এবং আমাদের ওমরাহ কবুল করুন। রিয়াদ বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি কাফেলার ছবিসহ জীবনের শেষ বার্তাটি দেন। তিনি লেখেন, আলহামদুলিল্লাহ আমাদের কাফেলা নিরাপদে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। জীবনের সেরা সফরের প্রতিটি মুহূর্ত কাটুক মহান রবের অশেষ রহমত ও মেহেরবানিতে। আজকের জোহরের নামাজ এখানেই আদায় হবে। বাকি সফরটুকুও যেন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়। প্রথমে নিখোঁজ থাকলেও পরে বন্ধু মো. খোরশেদ আলম, মুহাম্মদ রজীবুল হক এবং সৌদি দূতাবাস সূত্রের বরাতে ইহরাম পরিহিত অবস্থায় তার শাহাদাতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বাইতুল্লাহ জিয়ারতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে ইহরাম অবস্থায় এই তরুণ আলেমের বিদায়ে আলেম সমাজসহ সারাদেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বদরপুরে চলছে শোকের মাতম। ঘরে রয়েছেন বয়োবৃদ্ধ বাবা মাওলানা মোহাম্মদউল্লাহ ও মা জাহানারা বেগম।
সন্তান হারানোর শোকে তারা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী মাহবুবা। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অবস্থা তিন অবুঝ শিশুর। সাত বছরের বড় ছেলে, পাঁচ বছরের মেজো মেয়ে এবং মাত্র দুই বছরের ছোট ছেলেটি এখনো বুঝতে পারছে না যে তাদের স্নেহের বাবা আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবেন না, তাদের কোলে তুলে নেবেন না। বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা নিষ্পাপ শিশুদের চাহনি উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করছে।
















