সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর গুরুতর ও বিস্ফোরক অভিযোগের মুখে এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মরিয়মের আপন মামা ওবায়দুর রহমান। মাসুম বিল্লাহর দাবি, মামার প্রতারণা, ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেলের কারণেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মরিয়ম এবং শেষ পর্যন্ত এই মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করতে বাধ্য হন।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাসুম বিল্লাহ এসব তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গত ১৩ জুলাই মরিয়মের অত্যন্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ধারণ করেন তার আপন মামা ওবায়দুর রহমান। এরপর ওই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে ওবায়দুর মরিয়মের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ, টাকা দিতে না পারার কারণেই গত ২০ জুলাই রাতে মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে মরিয়ম মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন।

মরিয়মের বাবা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, "ওবায়দুর যদি এই ষড়যন্ত্র শুরু না করত, তবে আজ আমার মেয়ে বেঁচে থাকত। ও-ই ছিল মূল পরিকল্পনাকারী, ও-ই আমার মেয়ের জীবন নিয়ে খেলা করেছে।" তিনি আরও জানান, গত ১৩ জুলাই মরিয়মকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেখে এবং ঘরবন্দি অবস্থায় থাকতে না পেরে তিনি অত্যন্ত বিশ্বাসের সাথে তাকে তার মামা ওবায়দুর রহমানের কাছে যেতে দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্য হিসেবে ওবায়দুরকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে ওবায়দুর মরিয়মের ভিডিও ধারণ করে তাকে ব্ল্যাকমেলের ফাঁদে ফেলে।

মাসুম বিল্লাহর দাবি অনুযায়ী, ওবায়দুর ওই দিন সন্ধ্যায় ফোনকল করে ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। তিনি বলেন, "ওবায়দুরের কল রেকর্ড যাচাই করলে এই সত্য বেরিয়ে আসবে। ডিবি যদি ফোন রেকর্ডগুলো পরীক্ষা করে, তবে তারা সহজেই এই ১০ লাখ টাকা চাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারবে।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইজ্জতের কথা ভেবে তিনি এতদিন চুপ ছিলেন এবং কোনো মামলা করেননি। কিন্তু যখন টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলো এবং সম্পর্ক বিচ্ছেদ হলো, তখনই ওবায়দুর ভিডিওগুলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে মরিয়মকে চূড়ান্তভাবে তছনছ করে দেন।

মেয়ের মানসিক অবস্থার করুণ বর্ণনা দিতে গিয়ে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর মরিয়ম মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। লজ্জায় সে বাবা-মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত না। তাকে দেখলে সে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ত। মাসুম বিল্লাহ বলেন, "আমার সাথে বা ওর মায়ের সাথে সে লজ্জায় কথাই বলত না। আমি কাছে গেলে সে আমার পা জড়িয়ে ধরে ভেউ ভেউ করে কাঁদত। ও তো মাত্র ১৮ বছর বয়সী একটি মেয়ে ছিল। কোনো ভুল থাকলেও একজন মামার দায়িত্ব ছিল তাকে রক্ষা করা, কিন্তু সে উল্টো তার জীবন ধ্বংস করে দিল।"

উল্লেখ্য, গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি এমপি গাজী নজরুল ইসলামের এবং সেখানে তিনি তার দুই স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন। এই ঘটনায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার আসামিদের মধ্যে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ডিএমপির তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। বর্তমানে ডিবি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মামলাটি তদন্ত করছে এবং ওবায়দুর রহমানকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।