আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ব শান্তি ও মানবিকতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণের মাধ্যমে তিনি বিশ্বমঞ্চে এক নতুন ও দূরদর্শী বার্তা প্রদান করেছেন। তাঁর ভাষণের মূল উপজীব্য ছিল—বিশ্বের যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন বা বিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হওয়া উচিত যুক্তি, গঠনমূলক আলোচনা, শিক্ষা ও মানবতা; কোনো প্রকার সামরিক শক্তি বা অস্ত্র নয়।
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর চার দিনব্যাপী সফল সফর শেষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন দিক ও সফরের সাফল্য তুলে ধরেন প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী)। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই ঐতিহাসিক ভাষণে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখা, মানবিক মূল্যবোধের সুরক্ষা এবং বিশ্বায়নের এই জটিল যুগে দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পৃক্ততার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে থাকা অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।
প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘকে এমন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান, যেখানে সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। তাঁর বক্তব্যে সংঘাত নিরসনে আলোচনার গুরুত্ব ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষমতায়নের বিষয়টি বারবার উত্থাপন করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নাগরিকদের অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। এই একই শক্তিশালী বার্তা তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটেও প্রদান করেছেন।
এম ছালেহ আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পিত উদ্যোগের কথা জাতিসংঘে তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো কর্মসূচি, যা প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ভাষণের সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী একটি স্বপ্নের বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেন—যেখানে তরুণ সমাজ কোনো দ্বিধা ছাড়াই তাদের স্বপ্ন পূরণের সাহস পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নেতৃত্ব দেবে এবং প্রতিটি শিশু তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সমান সুযোগ পাবে। তাঁর ভাষায়, ‘সবার ওপরে মানুষ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবে।’
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি কেবল গতানুগতিক কোনো কূটনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। নিউইয়র্কে তাঁর চার দিনের সফর অত্যন্ত কর্মমুখর ছিল। তিনি সেখানে ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন, যার মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক এবং গুরুত্বপূর্ণ সাইডলাইন বৈঠক অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরাও প্রায় ৫০টি অতিরিক্ত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি বক্তব্য ও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে পৌঁছেছে এবং জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে গভীর মনোযোগ দিয়েছেন।
সফরকালে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন প্রেস সচিব। তিনি জানান, এবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারিভাবে মাত্র ৩৫ জন প্রতিনিধি ছিলেন এবং চার্টার্ড বিমানের পরিবর্তে তিনি নিয়মিত কমার্শিয়াল ফ্লাইটে ভ্রমণ করেছেন, যা একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারে কাজ করছেন, যাতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়। তিনি এমন একটি প্রাণবন্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে মানুষ একে অপরকে সম্মান করবে, বড়রা ছোটদের স্নেহ ও যত্ন করবে এবং ছোটরা বড়দের যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।
প্রেস সচিব আরও যোগ করেন, অন্যের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের আগে প্রধানমন্ত্রী নিজের আচরণে সেই আদর্শ বজায় রাখতে চেয়েছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সহনশীলতা ও মানবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সরকার একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধপরিকর। দেশের রাজনৈতিক অতীতের দীর্ঘ দমনপীড়ন ও ভয়ের সংস্কৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আব্দুল্লাহ ছালেহ বলেন, নতুন একটি উন্নত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই সন্ধিক্ষণে ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি এবং একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একটি সুন্দর রাষ্ট্র ও মানবিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজ গড়ে তোলার যে অনন্য সুযোগ আমরা পেয়েছি, তা যদি আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হই, তবে তা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান (হাসান শিপলু), উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা, সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির ও সহকারী প্রেস সচিব মো. নাজমুল হক খান উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: বাসস
















