রাজধানীর অভিজাত এলাকায় স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদির। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি বাস্তব পরিস্থিতি থেকে ‘ডিটাচড’ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে। রাজধানীর ইসিবি চত্বরে অবস্থিত ‘নিউগ্রিনি প্রপার্টিজে’ একদল দুর্বৃত্ত ব্যাপক হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হলে তা দিতে অস্বীকার করায় এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। স্টুডিওর মূল্যবান সরঞ্জামাদি ভাঙচুর ও লুট করা হয় বলে জানা গেছে।
এই স্পর্শকাতর ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এক বক্তব্যে দাবি করেন, সালমান মুক্তাদিরের কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। তিনি আরও বলেন, মুক্তাদিরের পক্ষ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যে ঢালাও অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, কেন এই ঘটনায় মামলা করা হয়নি। তিনি জানান, নির্দিষ্ট করে মামলা করা হলে যথাযথ তদন্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই dismissive বা অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সালমান মুক্তাদির একটি বিস্তারিত ভিডিও বার্তা প্রদান করেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি কিছুটা বিদ্রূপের সুরে লিখেছেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমেদ অ্যান্ড তারেক রহমান মে বি বুঝে নাই, কী হইছে কালকে’।
ভিডিও বার্তায় সালমান মুক্তাদির শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেন, “মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমি একটি ভিডিও দেখেছি যেখানে আপনি আমার স্টোরি নিয়ে কথা বলছেন। আপনি আমাকে ‘ভদ্রলোক’ বলেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, যদিও পুরো বাংলাদেশ আমাকে অভদ্র হিসেবে চেনে। তবে আপনার বক্তব্যের একটি দিক আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে—আপনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। সেই স্বাধীনতার জায়গা থেকেই আমি আজ আপনাকে রেসপন্ড করার সাহস পাচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ আমাকে এই সুযোগটি দেওয়ার জন্য।”
এরপরই তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমি খুব স্পষ্টভাবে একটি বিষয় আপনার সামনে উপস্থাপন করতে চাই। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা আপনার হাতে। রাজনৈতিক দলের পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। কারণ এই পদে আপনাকে সব ধরণের পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটি অত্যন্ত বড় একটি দায়িত্ব।”
মামলা দায়েরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অজ্ঞতাকে কটাক্ষ করে মুক্তাদির বলেন, “আপনি আপনার স্টেটমেন্টে আমাকে প্রশ্ন করেছেন যে, মামলা কেন দায়ের করা হয়নি। এই কথাটি অত্যন্ত হাস্যকর এবং এর মাধ্যমে আপনি আপনার পুরো বিভাগ এবং সরকারকে ছোট করে ফেলেছেন। আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে, আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনার অধীনে প্রতিটি থানা, প্রতিটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসন আপনার এক কলের আন্ডারে। অথচ আপনি জানেনই না যে মামলা দায়ের করা হয়েছে কি না! আপনার কাছে এই আপডেট নেই। আপনি আপনার দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রোটোকল থেকে কতটা ডিটাচড, তা এই কথাটি থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।”
পুলিশ স্টেশনে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি? আমি গতকাল ভোর চারটা পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্ট থানায় বসেছিলাম। চরম ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার আগে এবং আপনার স্টেটমেন্ট আসার আগে পর্যন্ত মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা হয়নি। আমি রাতের বেলাই গিয়ে সব প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম, তবুও কেন দেরি হলো? এই প্রশ্নের উত্তর দেশবাসীর কাছে আপনারই দেওয়ার কথা।”
বিএনপির নাম জড়ানো এবং চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সালমান মুক্তাদির বলেন, “আপনি যেভাবে মুচকি হেসে কথাগুলো বলেছেন, এখন আমারও হাসি পাচ্ছে। আমরা উভয়েই এক অর্থে অসহায়। আপনি হয়তো কিছু করতে পারছেন না, আর আমি পরিস্থিতির কারণে মুচকি হাসছি। আপনি হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন, আমিও হাসছি—কিন্তু এটাই আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের করুণ চিত্র। আমরা দুজনেই নাগরিক, অথচ আমরা এক চরম অসহায় পরিস্থিতিতে আছি।”
বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এখন ক্ষমতায় আছে বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের পর সবকিছু স্বাভাবিক হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আপনার দায়িত্ব। আপনার অধীনে যখন এই ধরণের ঘটনা ঘটে, তখন দায়ভার আপনারই। এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও কোদালের মতো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আমি তাদের ফোনের ভিডিও দেখেছি, তাদের চেহারা দেখেছি। তারা স্বীকার করেছে যে, মানুষের মারধরের পর তারা বিএনপির নাম নিয়েছে। তবুও আমি আমার মানসিক ভারসাম্য এবং সংযত কথা বজায় রাখতে চাইছি, তাই সরাসরি বিএনপির বিরুদ্ধে আঙুল তুলছি না।”
এরপরই তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আমি খুবই কনফিউজড যে, আপনি কি বিএনপির ‘পিআর ম্যানেজমেন্ট ক্রাইসিসের’ দায়িত্ব নিয়েছেন নাকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন? এখানে মূল সমস্যাটি ছিল নিরাপত্তা। ভূমি দখল, চাঁদাবাজি বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু আপনি প্রেস ব্রিফিংয়ে কোনো কার্যকর উত্তর দিলেন না, কোনো অ্যাকশন নিলেন না। বরং আপনি আমাকে ‘ভদ্রলোক’ বলে হালকা করে দিলেন এবং চাঁদাবাজির বিষয়টিকে উড়িয়ে দিলেন। আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনি এই বিষয়ে মাথা ঘামাবেন না, কিন্তু আপনি নিজেই এসে নিজেকে ছোট করলেন।”
ঘটনার স্থান এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনার জন্য বিষয়টি কতটুকু লজ্জাজনক তা আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না। এই ঘটনাটি ঘটেছে ১৭ নম্বর আসনে, যা তারেক রহমানের আসন। তার আসনে বাংলাদেশের একজন প্রমিনেন্ট কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যার লাখ লাখ ফলোয়ার, তার স্টুডিও এভাবে ধ্বংস করা হলো। আর আপনি একে ‘সামান্য ভাঙচুর’ বলে সহজ করে দিলেন। আপনার কি কোনো এম্প্যাথি বা সহানুভূতি নেই? আপনি কি বুঝতে পারছেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এর প্রভাব কী? আপনি কি কোনোভাবে সাধারণ মানুষের সাথে কানেক্ট করতে পারেন?”
নিজের সক্ষমতা এবং দৃঢ়তার কথা জানিয়ে মুক্তাদির বলেন, “আমার স্টুডিও ভেঙেছে, কিন্তু আমি যথেষ্ট স্ট্রং। আমি কারো কাছে ভিক্ষা চাই না। অনেক রাজনৈতিক দল থেকে আমার কাছে ফোন এসেছে, আমি চাইলে তাদের সাথে বসতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করছি না, কারণ আমি সাধারণ মানুষের ভরসা ভাঙতে চাই না। আমি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে চাই না। অনেক নিউজ চ্যানেল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, আমি চাইলে সেখানে গিয়ে সব পরিষ্কার করতে পারতাম। কিন্তু আমি আপনার কাছে বলছি—আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া নেই। আমার টাকা-পয়সা লাগবে না, স্টুডিও বানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি আবার সব বানিয়ে ফেলব, কারণ এটা আমার স্বপ্ন এবং আল্লাহ আমাকে সেই শক্তি দিয়েছেন।”
সবশেষে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, “যদি আপনি আমার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে তা আপনার ব্যর্থতা। পুরো বাংলাদেশ দেখছে যে, সালমান মুক্তাদিরের মতো একজন মানুষের সাথে যা করা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা মুচকি হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন। আপনি কি নিজে কনফিডেন্ট ফিল করেন? আপনার কি একটুও লজ্জা কাজ করে না যে, প্রধানমন্ত্রীর আসনের এত কাছে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে এমন ঘটনা ঘটল এবং বিএনপি সরকারের চোখের সামনেই তা হলো? আপনি হয়তো বুঝতে পারছেন না কেন আপনার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে।”
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে বিভ্রান্তির জবাবে তিনি জানান, লুটপাটের সময় দুর্বৃত্তরা সার্ভারসহ সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ভেঙে নিয়ে গেছে, যা সাধারণত পরিকল্পিত অপরাধের লক্ষণ। তবে বিভিন্ন ফোনের ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর প্রমাণ রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তিনি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছেন না এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তিনি তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তবে একতরফা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের পরিবর্তে স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।
















