জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্পিকারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে গত এপ্রিল মাসেও দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা বর্তমান বৈঠকের গুরুত্ব ও ধারাবাহিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাক্ষাৎকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, চীন দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের এক ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে দেশটির সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিরলসভাবে সহযোগিতা করে আসছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা দুই দেশের বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করে। একইসাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং একে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলে তিনি স্মরণ করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক অর্থ পাচার এবং গুম ও খুনের রাজনীতির কারণে সাধারণ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। তবে সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে পুনরায় গণতন্ত্রের প্রকৃত পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মানুষ তাদের দীর্ঘপ্রতীক্ষিত ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
সংসদীয় সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে স্পিকার বলেন, বাংলাদেশ-চীন সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ দুই দেশের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এই গ্রুপের মাধ্যমে দুই দেশের সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও নীতিগত সমন্বয় আরও উন্নত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন। এই মানবিক সংকট দ্রুত সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে চীন সরকারের সক্রিয় ও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
অন্যদিকে, চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণের পূর্ণ ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং একে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এই সফরটি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও বেগবান করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তিনি জানান, কেবল বড় বড় মেগাপ্রকল্পগুলোই নয়, বর্তমানে বাংলাদেশে মাঝারি ও ছোট আকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পেও চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। ইয়াও ওয়েন আরও জানান, চীন বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের একটি প্রধান পণ্য উৎপাদনভিত্তিক কেন্দ্রে পরিণত করতে আগ্রহী। বিশেষ করে আইসিটি এবং বিভিন্ন ধরণের লজিস্টিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর স্থাপন, চলমান রোহিঙ্গা সংকট এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। স্পিকার স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ সবসময় ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ বা একক চীন নীতি সমর্থন করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও এই দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি ভোলাসহ বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান, যাতে দেশের জ্বালানি খাতের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়।
পাশাপাশি, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জোহরত আদিব চৌধুরীর প্রার্থিতার বিষয়ে চীন সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন স্পিকার। সাক্ষাৎকালে চীনা দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
















