কুড়িগ্রামে সার বিতরণে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে, যা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। একের পর এক অপ্রীতিকর ও সহিংস ঘটনা জেলায় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। সার বিতরণে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার ফলে কৃষকদের ভোগান্তি এখন চরমে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতির জন্য কৃষি বিভাগের ‘একগুঁয়েমি’ এবং চরম অবহেলাকে দায়ী করছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ডিলারের গুদাম থেকে সরিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে ডিলার পয়েন্টগুলোতে শত শত কৃষককে জড়ো করে সার বিতরণ করা হচ্ছে, যা চরম বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা সার না পেয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এবং এর ফলে সরকারও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রশাসনের দাবি, তারা চেষ্টা করলেও কৃষি বিভাগের lack of interest বা অনীহার কারণে ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না।
গত কয়েক সপ্তাহে জেলায় সার নিয়ে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুরে একটি ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের বিশাল ভিড় দেখে ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন। এতে ক্ষিপ্ত কৃষকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে গত রবিবার কুড়িগ্রাম সদরের ঘোগাদহ ও ভোগডাঙা ইউনিয়নে ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঘোগাদহে সার বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় অপেক্ষমান কৃষকরা ক্ষোভে বিএস-কে মারধর করে আহত করেন। তারও আগে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নে কৃষকরা আরেক বিএস-কে চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে ইউএনও এসে তাকে উদ্ধার করেন। গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চর রাজিবপুর উপজেলার রাজিবপুর বাজারের ডিলারের গুদাম ভাঙচুর করে কৃষকরা সার নিয়ে যান। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর রৌমারীতে এবং ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীতেও একই ধরনের অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, কৃষি বিভাগের সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকদের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। বিতরণ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের পরামর্শ দিলেও কৃষি বিভাগ তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম কুড়িগ্রামে এসে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। গত রবিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে কৃষি কর্মকর্তা, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কৃষকদের সুবিধা ও সুষ্ঠু বিতরণের স্বার্থে ডিলার গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি সম্মেলন কক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে; মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি বৈঠক চলাকালীন সময়েও সদরের ভোগডাঙা, ঘোগাদহ ও হলোখানা ইউনিয়নে ডিলারদের গুদামের সামনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং কৃষি কর্মকর্তা হামলার শিকার হন।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী সার মেলে না। বেশিরভাগ কৃষক সার না পেয়েই ফিরে যান, যা তাদের শ্রম ও সময়ের অপচয় ঘটায়। উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজারে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার পয়েন্ট ‘মেসার্স মো. আকবর আলী’-তে গিয়ে দেখা যায়, ইউনিয়নের প্রায় সকল কৃষক সেখানে ভিড় করে আছেন। পাঁচ জনকে এক বস্তা সার দেওয়ার পরও অসংখ্য কৃষক খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। ইউনিয়নের যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিন দিন ধরে ঘুরছি, আজ আসলাম কিন্তু কিছুই পেলাম না। নিয়ম বলছে পাঁচ জনের আইডি কার্ড আনতে হবে, যা অসম্ভব। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আবাদ ও কামলা—সবই শেষ হয়ে যাবে।’ একই ইউনিয়নের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও কৃষক বলেন, ‘আগে খুচরা দোকানে সার পাওয়া যেত, এখন ডিলারের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।’
বিসিআইসি সার ডিলার রমজান আলী জানান, গত বছর খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বিতরণ করা হলেও এবার শুধু ডিলার পয়েন্টে কেন্দ্রিক হওয়ায় বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। উলিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার শহীদুল ইসলাম নিশ্চিত করেন যে, ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা এখনো চালু হয়নি। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘সর্বসম্মতিক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা কার্যকর না হওয়ায় এই অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে।’ এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দিলেও তারা গড়িমসি করছে। মাঠপর্যায়ে তাদের গাফিলতি ও অনীহা স্পষ্ট। এই বিশৃঙ্খলার কারণে ডিডিকে বদলিও করা হয়েছে। আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি এবং পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক বিতরণ শুরু করার চেষ্টা করছি।’
















