উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ত্রুটি ও বিস্তারিত নকশার সঙ্গে এর অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রকল্পের বাজেট ও সময়সীমা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রস্তুতকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিব এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, ফিজিবিলিটি স্টাডি ও বিস্তারিত নকশার মধ্যে যে বড় ধরনের পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কমিয়ে এনে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী নীতিগত সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, যা আগামী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উপস্থাপন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ছিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় মোট ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৮টি নতুন, ৩টি সংশোধিত এবং ২টি মেয়াদ বৃদ্ধির প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ ১০ হাজার ১১৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আসছে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। এছাড়া প্রকল্প ঋণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ২৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে ধরা হয়েছে ৩৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাস্থ্য সেবা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২টি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২টি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ২টি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২টি প্রকল্প রয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থ, সমাজকল্যাণ, ভূমি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি করে প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
প্রকল্পের টেকনিক্যাল ত্রুটি ও নকশার অসামঞ্জস্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণত প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডির ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পের ডিপিপি (ডিজিটাল প্রকল্প প্রোফাইল) তৈরি করা হয়। তবে সেই পর্যায়ে বিস্তারিত নকশা অন্তর্ভুক্ত থাকে না। পরবর্তীতে যখন বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ও অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে। মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ নর্থের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে এই সমস্যা প্রকটভাবে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে স্টেশনের যে গভীরতা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বিস্তারিত নকশা অনুযায়ী তা প্রায় তিন গুণ বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। দেশের ভৌগোলিক ও ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এমন পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা মূলত প্রাথমিক পরিকল্পনার ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
তাই ফিজিবিলিটি স্টাডি যেন কেবল একটি রুটিন কাজ বা আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের বিষয় না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিপিপি প্রণয়ন ও প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণে এর সঠিক ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রকল্পের বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো যায় এবং অপচয় রোধ করা যায়।
প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়েও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এখন থেকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব নয়। যদি কোনো অসংগত কারণে সময় বাড়ানো হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে ইন্টারনেট সুবিধা, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ও হাইস্পিড ইন্টারনেটের মতো প্রয়োজনীয় বিষয় যুক্ত করতে হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করে জুন ২০২৭ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
যশোর বিমানবন্দর প্রকল্পের ক্ষেত্রে একটি বড় অসংগতি চিহ্নিত করার কথা জানান তিনি। ২০২৩ সালে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে ব্যয় বাড়লেও তা ডিপিপিতে প্রতিফলিত হয়নি, যা বর্তমান সরকার একটি বড় অসংগতি হিসেবে দেখছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ম্যালেরিয়া, এইচআইভি/এইডস ও যক্ষ্মা মোকাবিলা প্রকল্পের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যয় ও অগ্রাধিকার বিষয়েও একনেক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। গ্লোবাল ফান্ডের ঋণের শর্তাবলি বিবেচনায় এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের ব্যয় ও গুরুত্ব নির্ধারণে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সবশেষে প্রতিমন্ত্রী জানান, আইএমএফ (IMF) ইতিমধ্যে আটটি প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং আরও কয়েকটি প্রতিবেদন শীঘ্রই আসবে। এসব প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতেও পাঠানো হয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি প্রকল্প নির্ধারিত বাজেট ও সময়ের মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করা।
















