ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রাসাদে অবস্থান নিয়েছেন সৌদি যুবরাজ ও প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ বিন সালমান। সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিদের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলা এবং নতুন করে বড় ধরনের আক্রমণের পূর্বাভাসে সৌদি রাজপরিবার ও শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রিয়াদের মতো কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ৪১ বছর বয়সী যুবরাজের চলাচল ও অবস্থান নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দৈনন্দিন গতিবিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সর্বশেষ জনসমক্ষে তাঁকে রক্ত দিতে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে দেশের আর কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায়নি। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে গত সপ্তাহজুড়ে রিয়াদসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের বিমান যোগাযোগ ও সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চরম চাপে পড়েছে। বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বারবার হামলার ফলে যাত্রী নিরাপত্তা, নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথের স্থিতিশীলতা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।
সৌদি সরকারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত এবং অন্তত ৩০৯ জন আহত হন। এই ঘটনার রেশ কাটার আগেই পরদিন রোববার বিমানবন্দরের ৪ নম্বর টার্মিনালে আবারও হামলা চালায় হুতিরা। এতে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং আরও ১১ জন গুরুতর আহত হন। শুধু রিয়াদই নয়, দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আভা, জিজান ও নাজরান বিমানবন্দরগুলোকেও হুতিরা প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। হুতিদের আক্রমণ এখন আর কেবল বিমানবন্দরে সীমাবদ্ধ নেই। রিয়াদের প্রাণকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হচ্ছে। শহরের আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক স্কুলগুলোর শিক্ষার্থী এবং রিয়াদে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের ভবন ছেড়ে দ্রুত বাঙ্কার বা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বিভাগ। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রিয়াদের আকাশে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও এর জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও পাশের চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর পড়ে।
এতে বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি প্রশাসনের উদ্বেগ অনেক বেড়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরও জানিয়েছে, লাগাতার আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। সীমিত এই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ায় ইন্টারসেপ্টরগুলো এখন শুধু রাজপ্রাসাদ ও প্রধান জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশসীমার সার্বিক নিরাপত্তা ফেরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার জোর চেষ্টাও চালাচ্ছে দেশটি।





















