মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানায় এক ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনার সাক্ষী থাকল স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রচলিত প্রথা ভেঙে বিদায়বেলায় কেউ দিলেন বাড়ির গাছের তাজা লাউ, কেউ উপহার হিসেবে নিয়ে এলেন হাঁস-মুরগি ও ডিম, আবার কেউ নিয়ে এসেছেন মৌসুমি ফল। এই অসাধারণ ও আন্তরিক উপহারের মধ্য দিয়ে হরিরামপুর থানার বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আফজাল হোসেনের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেন এলাকার সাধারণ মানুষ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় থানা প্রাঙ্গণে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদায়ী ওসি মোহাম্মদ আফজাল হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো এবং নবাগত ওসি জেওএম তৌফিক আজমকে স্বাগত জানানো। অনুষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশ নেন, যার মধ্যে ছিলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং নানা বয়সী নারী-পুরুষ।
সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের বিদায়বেলায় দামি উপহার বা ক্রেস্ট দেওয়ার প্রচলন থাকলেও, হরিরামপুরের মানুষ এখানে দেখিয়েছেন এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত। তাদের কাছে দামী উপহারের চেয়ে নিজেদের হাতের ফল ও ফসল অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। এই ব্যতিক্রমী উপহারগুলো ছিল স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত ভালোবাসা এবং বিদায়ী ওসির সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। অনুষ্ঠানে বিদায়ী ওসি মোহাম্মদ আফজাল হোসেনকে ফুলের মালা ও তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান উপস্থিত সবাই। একই সঙ্গে নবাগত ওসি জেওএম তৌফিক আজমকেও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।
পুরোনো স্মৃতিচারণ, কুশল বিনিময় এবং বিদায়ী কর্মকর্তার সঙ্গে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আন্তরিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। চরাঞ্চল থেকে নিজ গাছের জাম্বুরা নিয়ে আসা হাবেজা খাতুন নামের এক নারী আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘স্যার আমাদের চরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। বিপদের সময় তিনি সবসময় আমাদের পাশে ছিলেন। তাই আমি খুশি হয়ে এই জাম্বুরা উপহার হিসেবে এনেছি।’
একইভাবে, হাঁস-মুরগি নিয়ে আসা জমেলা বেগম বলেন, ‘আমাদের ওসি স্যার চলে যাচ্ছেন। তিনি মানুষ হিসেবে অনেক ভালো ছিলেন। তাই তাকে ভালোবাসা জানাতে হাঁস আর মুরগি উপহার দিলাম।’ এছাড়া নিজের গাছের লাউ নিয়ে আসা আরেক নারী বলেন, ‘উনি সত্যিই অনেক ভালো মানুষ। আমাদের বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থেকেছেন। আমার এই সামান্য উপহারটি স্যারের প্রতি আমার ভালোবাসার চিহ্ন।’
নবাগত ওসি জেওএম তৌফিক আজম তার বক্তব্যে বলেন, ‘পুলিশের চাকরি বদলির চাকরি। আজ আমরা এখানে, কাল হয়তো অন্য কোথাও। আমি বিদায়ী ওসি আফজাল হোসেন সাহেবের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। তিনি যেভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, আমিও হরিরামপুরবাসীর কাছে সেই একই ধরনের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রত্যাশা করি।’
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বিদায়ী ওসি মোহাম্মদ আফজাল হোসেন বলেন, ‘চাকরি এবং বদলি একে অপরের পরিপূরক। তবে বিদায়বেলায় হরিরামপুরের সাধারণ মানুষ আমাকে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান দিয়েছেন, তা আমার কাছে সত্যিই অকল্পনীয়। আমার দীর্ঘ চাকরিজীবনে এমন আন্তরিক বিদায় আমি আগে কখনো দেখিনি। আমি সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করি এবং সবার কাছে দোয়া চাই। হরিরামপুরের মানুষের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো এবং এই গভীর সম্পর্ক আমার সারাজীবন মনে থাকবে।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে ফুল দিয়ে সাজানো গাড়িতে করে নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন মোহাম্মদ আফজাল হোসেন। সেই সময় থানার সামনে জড়ো হওয়া শত শত স্থানীয় মানুষ তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান।
উল্লেখ্য যে, এর আগের দিন মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) হরিরামপুর থানার নতুন ওসি হিসেবে জেওএম তৌফিক আজম আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর তার পরদিনই স্থানীয়দের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
















