ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ক্রোয়েশিয়াকেও ধুলিসাৎ করে দিল স্পেন। উয়েফা নেশনস লিগে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়ে গ্রুপ ‘এ৩’-এর শীর্ষস্থান আরও মজবুত করল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। মঙ্গলবার রাতে স্পেনের ঘরের মাঠ রামোন সানচেজ-পিজুয়ান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে স্প্যানিশরা। ম্যাচের নায়ক হিসেবে উঠে এসেছেন বার্সেলোনার বিস্ময়কর তরুণ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল, যিনি জোড়া গোল করে স্পেনের জয় নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া মার্ক পুবিল ও নিকো উইলিয়ামসের গোল স্পেনের এই বিশাল ব্যবধান পূর্ণতা দেয়।

ম্যাচ শুরুর মুহূর্ত থেকেই স্প্যানিশ ফুটবলারদের আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। স্বাগতিকরা বল দখলে রেখে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগকে চাপে রাখতে শুরু করে। ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই মাঠের উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় যখন লামিনে ইয়ামাল গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। অ্যালেক্স বায়েনার কাছ থেকে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে নিচু শটে ক্রোয়েশিয়ার জালে বল জড়ান এই তরুণ তারকা। উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গত ম্যাচেও ওয়েম্বলিতে মাত্র দুই মিনিটের মাথায় গোল করেছিলেন ইয়ামাল। মাত্র চার দিন পর আবারও একইভাবে দ্রুত গোল করে তিনি প্রমাণ করলেন কেন তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান প্রতিভা।

স্পেনের এই দ্রুত গোল হজম করে ম্যাচে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় ক্রোয়েশিয়া। সফরকারীরা একের পর এক আক্রমণ গড়ে স্প্যানিশ রক্ষণভাগকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ম্যাচের ২৮তম মিনিটে সমতা ফেরাতে সক্ষম হয় ক্রোয়েশিয়া। ইভান পেরিসিচের একটি নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান দিয়ন বেলজো। বেলজোর এই গোলে ম্যাচের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা উভয়ই বেড়ে যায়। তবে সমতার আনন্দ বেশিক্ষণ উপভোগ করতে পারেনি ক্রোয়াটরা। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে আবারও স্পেনের দাপট ফিরে আসে। ৩১তম মিনিটে লামিনে ইয়ামালের করা একটি চমৎকার ক্রস থেকে হেডে গোল করে দলকে আবারও এগিয়ে দেন মার্ক পুবিল। জাতীয় দলের হয়ে এটি ছিল পুবিলের জীবনের প্রথম গোল, যা স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে মাতিয়ে দেয়।

দ্বিতীয় গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্পেনের হাতে চলে আসে। বল দখলে রেখে তারা ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ক্রোয়েশিয়া পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করলেও স্পেনের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের সুসংগঠিত পারফরম্যান্সের কারণে তারা খুব একটা সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধেও স্পেনের আক্রমণাত্মক ফুটবল অব্যাহত ছিল। ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে আবারও গোল উৎসবের সূচনা করেন লামিনে ইয়ামাল। পেদ্রির কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের ডান দিক দিয়ে ভেতরে ঢুকে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমে স্পেনের ব্যবধান ৩-১ হয়ে যায় এবং ক্রোয়েশিয়ার ফেরার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

ম্যাচের শেষ দিকে ক্রোয়েশিয়া গোলের জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালালেও স্পেনের দৃঢ় রক্ষণভাগ তাদের কোনো সুযোগই দেয়নি। বরং পাল্টা আক্রমণ থেকে ম্যাচের ভাগ্য নিশ্চিত করে স্পেন। ৮৯তম মিনিটে মিকেল মেরিনোর পাস পেয়ে বক্সের ভেতর থেকে জোরালো শটে গোল করেন নিকো উইলিয়ামস। তার এই অনবদ্য গোলে স্পেনের জয় ৪-১ ব্যবধানে চূড়ান্ত হয়। এই জয়ের মাধ্যমে নেশনস লিগে পরপর দুই ম্যাচে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে গ্রুপ ‘এ৩’-এর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে লা রোজারা।

এই ম্যাচে স্পেনের সাফল্যের মূলে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল। তার অসাধারণ পারফরম্যান্স স্পেনের আক্রমণভাগে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক জীবন্ত দলিল। তবে এই জয়ের গুরুত্ব কেবল একটি ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এই জয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ৪০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে স্পেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড এখন এককভাবে স্পেনের দখলে। এর আগে এই রেকর্ডের তালিকায় ইতালি ও স্পেনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইতালি টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত ছিল, যা এবার স্পেন ভেঙে ৪০ ম্যাচে নিয়ে গেছে।

স্পেনের এই অবিরাম যাত্রা ফুটবল বিশ্বে তাদের আধিপত্যের জানান দিচ্ছে। ইউরো এবং নেশনস লিগের মতো বড় আসরে তাদের ধারাবাহিকতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়ার জন্য এই হার গ্রুপ পর্বে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথমার্ধে সমতা ফেরানোর পর আবারও গোল হজম করায় তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়। নেশনস লিগের পরবর্তী ম্যাচে রবিবার চেক প্রজাতন্ত্রের মুখোমুখি হবে স্পেন। অন্যদিকে, শনিবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে ক্রোয়েশিয়া। স্পেনের এই অপরাজিত যাত্রা এবং ইয়ামালের ফর্ম আগামী ম্যাচগুলোতে তাদের আরও আত্মবিশ্বাস জোগাবে।