একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় সংকটে পড়েছে নেপালের পর্যটন খাত। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে দেশটির পর্যটন খাতে প্রায় ৫২৬৭ কোটি নেপালি রুপি বা ৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। পর্যটনের প্রধান মৌসুম শুরুর ঠিক আগে এই আঘাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

মাউন্ট এভারেস্টসহ বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, হিমালয়ের মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতির কারণে নেপাল আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। দেশটির অর্থনীতিতেও এই খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং ২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পর আবারও বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত হলো পর্যটন ব্যবসা।

নেপালের পর্যটন বোর্ডের কুইক রেসপন্স টিমের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে খাতটির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫২৬৭ কোটি রুপি। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট যানবাহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক দুর্যোগে প্রাণহানিও হয়েছে ব্যাপক। হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট বন্যা ও পরবর্তী ভূমিধসে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটকরাও রয়েছেন বলে জানা গেছে। বন্যায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

এমনকি দুর্যোগের সরাসরি প্রভাবমুক্ত এলাকাগুলোতেও পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিভিন্ন দেশের দেওয়া ভ্রমণ সতর্কতার কারণে অনেকে নেপাল সফরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে পর্যটক আগমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পর্যটন অবকাঠামোর ক্ষতিও কম নয়। বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৪২টি হোটেল, ৫৭টি রেস্তোরাঁ এবং ১৪১টি পর্যটনসংশ্লিষ্ট যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে পর্যটকদের আবাসন, যাতায়াতসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে অন্যতম ব্যস্ত পর্যটন মৌসুম শুরু হয়। এ সময় আকাশ পরিষ্কার থাকায় পর্বতারোহণ ও ট্রেকিংসহ নানা কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক দেশটিতে যান। ফলে মৌসুমের শুরুতেই এমন দুর্যোগ পর্যটন ব্যবসার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদানও উল্লেখযোগ্য। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশের সঙ্গে খাতটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। এ খাতের সঙ্গে ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসও পর্যটন।

দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা ফেরানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু মেরামত, পর্যটন স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন এবং নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে নেপালের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা না গেলে ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। ভূমিকম্প ও করোনা মহামারির পর পুনরুদ্ধারের পথে ফিরেছিল নেপালের পর্যটন। নতুন এই দুর্যোগ সেই অগ্রযাত্রায় আবারও বাধা তৈরি করেছে। এখন ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও পর্যটকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই খাতটির পুনরুদ্ধারের মূল চ্যালেঞ্জ।