মো: আরিফুল ইসলাম

পাবনা জেলার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আটঘরিয়া উপজেলা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। প্রাচীন বসতি, ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক বিকাশ, একাত্তরের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই উপজেলাকে পাবনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটঘরিয়া নামকরণের সবচেয়ে প্রচলিত ও শক্তিশালী জনশ্রুতি হলো আটটি ঘরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বসতি। প্রাচীনকালে এই জনপদে সর্বপ্রথম আটজন ব্যক্তি বা আটটি পরিবার এসে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। সেই আটটি ঘর বা আট ঘরের বসতিকে কেন্দ্র করেই এলাকাটি লোকমুখে আটঘরিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে। কালের পরিক্রমায় সেই নামই প্রশাসনিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

অতীতে এই অঞ্চলে চোর-ডাকাতের চরম উপদ্রব ছিল। বিশেষ করে চলনবিল এলাকার ডাকাতদল রত্নাই ও চন্দ্রাবতী নদী ব্যবহার করে এ অঞ্চলে এসে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করত। এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ আমলে প্রথমে এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মৃত লালন সিংহের স্ত্রী মাতঙ্গিনী সিংহ ফাঁড়ির জন্য ১১ বিঘা জমি দান করলে ১৯২৮ সালের ১৬ অক্টোবর আটঘরিয়া পূর্ণাঙ্গ থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ধারায় ১৯৮৩ সালে এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আটঘরিয়া এক ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সাক্ষী। ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই এখানকার ছাত্র, যুবক ও সাধারণ জনতা মুক্তিযুদ্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। ভারত থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এই অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর মাজপাড়া ইউনিয়নের বংশীপাড়া গ্রামে চন্দ্রাবতী নদীর তীরে পাবনা জেলার সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ বাঁধে।

এই সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন কর্নেল তাহেরসহ প্রায় ১৩ থেকে ৩০ জন সেনা নিহত হয় বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ঘটনাস্থলেই ১০ জন বীর মুক্তিসেনা শাহাদাত বরণ করেন। এছাড়া আরও মুক্তিযোদ্ধা ও ৭ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধকে স্মরণীয় করে রাখতে চন্দ্রাবতী নদীর পাড়ে বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

বংশীপাড়া সম্মুখ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী ১০ জন বীর শহীদের নাম সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁরা হলেন শহীদ আবুল কাশেম, শহীদ আব্দুল খালেক, শহীদ ইউনুছ আলী, শহীদ নায়েব আলী, শহীদ আব্দুর রশিদ, শহীদ আব্দুল মালেক, শহীদ শহিদুল ইসলাম, শহীদ আব্দুস সাত্তার, শহীদ মনছুর আলী ও শহীদ আব্দুর রাজ্জাক। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের আশপাশে আরও বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন।

আটঘরিয়া মূলত কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও এখানে বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত প্রধান ঐতিহাসিক স্থান। দেবোত্তর ইউনিয়নের গোড়রী গ্রামে অবস্থিত গোড়রী আদি দুর্গা মন্দির অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহাসিক। মাজপাড়া গ্রামে অবস্থিত মৃধার মসজিদ বা শাহী মসজিদ ও খানবাড়ি মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের প্রাচীন নিদর্শন। এছাড়া চাঁদভা ইউনিয়নের চন্দ্রনাথ সেনের জমিদার বাড়ি, দেবোত্তর জমিদার বাড়ি এবং খিদিরপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রানি ভবানীর কাচারিবাড়ি সোনালি অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।

ঢাকা কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আটঘরিয়ার দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে হলে প্রথমে পাবনা জেলা শহরে আসতে হবে। সেখান থেকে সহজেই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যাওয়া যায়। বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ মাজপাড়া ইউনিয়নের বংশীপাড়া গ্রামে অবস্থিত। পাবনা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল অথবা আব্দুল হামিদ রোড থেকে বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় দেবোত্তর বাজারে আসতে হবে, যার দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। এরপর দেবোত্তর বাজার থেকে ইঞ্জিনচালিত ভ্যান অথবা ইজিবাইকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই স্মৃতিসৌধে পৌঁছানো যায়।

চাঁদভা ইউনিয়নে অবস্থিত চন্দ্রনাথ সেনের জমিদার বাড়ি দেখতে পাবনা শহর থেকে সিএনজি বা লোকাল বাসে প্রথমে আটঘরিয়া বাজারে আসতে হবে। আটঘরিয়া বাজার থেকে ইজিবাইক বা ভ্যানে সরাসরি চাঁদভা বাজারে নামতে হবে। চাঁদভা বাজারের সঙ্গেই এই প্রাচীন জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। মাজপাড়া গ্রামের মৃধার মসজিদে যেতে পাবনা শহর থেকে আটঘরিয়াগামী সিএনজি বা বাসে টেবুনিয়া হয়ে মাজপাড়া ইউনিয়নে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে ভ্যান বা রিকশায় সহজেই ঐতিহাসিক মসজিদে যাওয়া যায়। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের টানে প্রতিবছর বহু দর্শনার্থী এই স্থানগুলোতে ভিড় করেন।