জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

ইসলামে পর্দা কেবল মাথায় ওড়না দেওয়া কিংবা শরীর ঢেকে রাখা কোনো বিচ্ছিন্ন বিধান নয়, বরং এটি দৃষ্টি, পোশাক, কথাবার্তা, চলাফেরা, সৌন্দর্য প্রকাশ ও সামাজিক আচরণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সামগ্রিক নৈতিক ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে শালীনতা রক্ষা, অনুচিত আকর্ষণ এড়িয়ে চলা এবং নারী-পুরুষ উভয়ের মর্যাদা ও পবিত্রতা সংরক্ষণ করা। তাই নারীর পূর্ণাঙ্গ পর্দা বুঝতে হলে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

পর্দার মূলনীতি সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা দ্ব্যর্থহীন। সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে প্রথমে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থান হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও একই নির্দেশ দিয়ে সৌন্দর্য প্রকাশের সীমা রক্ষা এবং ওড়না বক্ষদেশের ওপর টেনে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নারীদের বহিরাবরণ ব্যবহার করে নিজেদের আবৃত রাখার নির্দেশ রয়েছে। এসব আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয়, পর্দা নারীর জন্য একটি শরয়ি দায়িত্ব; তবে পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখা ও শালীন আচরণ করাও সমানভাবে ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ।

নারীর কণ্ঠস্বর দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক, কারণ এ বিষয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত। নারীর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর নিজে নিজে সতর বা হারাম নয়। একজন নারী প্রয়োজন অনুযায়ী পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন, শিক্ষালাভ করতে পারেন, চিকিৎসা নিতে পারেন, ব্যবসায়িক বা সামাজিক প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে পারেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগেও নারীরা নবীজি সা. এর কাছে প্রশ্ন করেছেন, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলেছেন। অতএব, নারীর কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই তা হারাম এমন সর্বজনীন বিধান প্রতিষ্ঠিত নয়।

তবে কণ্ঠস্বরের ধরন ও কথাবার্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শরিয়তের নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আল-আহযাবের ৩২ নম্বর আয়াতে নবীজি সা. এর স্ত্রীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, তাঁরা যেন এমন কোমল বা আকর্ষণসৃষ্টিকারী ভঙ্গিতে কথা না বলেন, যাতে অন্তরে ব্যাধি থাকা কেউ প্রলুব্ধ হয়; বরং তাঁরা যেন সংগত ও শালীন কথা বলেন। আয়াতটি নবীজি সা. এর স্ত্রীদের উদ্দেশে নাজিল হলেও এর মধ্যে থাকা শালীনতার শিক্ষা মুসলিম নারীদের জন্যও প্রাসঙ্গিক। এর অর্থ এই নয় যে, নারীর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর নিষিদ্ধ, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে প্রলুব্ধকর ভঙ্গি, অশালীন কথাবার্তা কিংবা অনুচিত আকর্ষণ তৈরির চেষ্টা পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে পুরুষকেও নিজের দৃষ্টি, শ্রবণ ও আচরণ সংযত রাখতে হবে।

পোশাকের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর চুল, গলা, বক্ষদেশ, বাহু, পা এবং শরীরের অন্যান্য অংশ যথাযথভাবে আবৃত রাখা পর্দার মৌলিক শর্ত। পোশাক এমন হতে হবে, যা শরীর ঢাকে, স্বচ্ছ নয় এবং শরীরের গঠন স্পষ্ট করে প্রকাশ করে না। শুধু মাথায় ওড়না থাকলেই পূর্ণাঙ্গ পর্দা সম্পন্ন হয় না, যদি গলা, বক্ষদেশ বা শরীরের অন্য অংশ অনাবৃত থাকে। একইভাবে শরীরের ওপর এমন আঁটসাঁট পোশাক পরা, যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন স্পষ্ট করে, পর্দার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বোরকা, আবায়া, বড় চাদর কিংবা অন্য কোনো পোশাকের নাম নয়, বরং পোশাকটি শরিয়তের আবরণের শর্ত পূরণ করছে কি না, সেটিই মূল বিবেচ্য। পোশাকের রং নিজে নিজে হারাম নয়; তবে সাজসজ্জা ও প্রদর্শনপ্রবণতার মাধ্যমে অনুচিত আকর্ষণ তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

নারীর মুখ ও হাত ঢাকার বিধান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে স্বীকৃত মতপার্থক্য রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, পরপুরুষের সামনে নারীর মুখ ও হাত সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, ফলে শালীনতা বজায় রেখে মুখ ও হাত খোলা রাখার অবকাশ রয়েছে। হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এ মতের অর্থ এই নয় যে, সৌন্দর্য প্রদর্শন, অনুচিত সাজসজ্জা কিংবা প্রলুব্ধকর আচরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বহু আলেম, বিশেষত হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ধারার আলেমরা, মুখ ঢাকাকে আবশ্যক মনে করেন। তাঁদের মতের পেছনে পর্দার আয়াত, সংশ্লিষ্ট হাদিস এবং ফিতনা থেকে সুরক্ষার যুক্তি রয়েছে।

এখানে সিদ্ধান্তটি পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে, মুখ ঢাকাকে সব আলেমের সর্বসম্মত ফরজ বলা সঠিক নয়, আবার নিকাবকে শরিয়তসম্মত ও গ্রহণযোগ্য আমল হিসেবে অস্বীকার করাও ঠিক নয়। যাঁরা নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুসারে নিকাব পরিধান করেন, তাঁদের আমলকে সম্মান করা উচিত। যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের প্রসিদ্ধ মত অনুসারে মুখ ও হাত খোলা রাখেন, তাঁদেরও শুধু এ কারণে পর্দাহীন বলা যায় না। তবে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুচিত দৃষ্টি বা ফিতনার বাস্তব আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট বিধান ও করণীয় সম্পর্কে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মিসরের দারুল ইফতার প্রকাশিত ফতোয়াতেও মুখ ও হাতের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহের মত এবং নিকাবের বিধানসংক্রান্ত মতপার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। দারুল ইফতা, নিকাবের বিধান পায়ের আবরণের ক্ষেত্রেও ফিকহি মতভেদ রয়েছে। হানাফি মাযহাবে পা সম্পর্কে অবকাশের একটি প্রসিদ্ধ মত আছে; অন্যদিকে বহু আলেম পা ঢেকে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই যে নারী অধিক সতর্কতার সঙ্গে পা ঢেকে রাখতে চান, তিনি তা করতে পারেন। আর নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণকারী নারী তাঁর মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহি নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করবেন। এ ধরনের মতভেদকে কেন্দ্র করে অন্যকে অবজ্ঞা করা কিংবা কোনো একটি মতকে সব আলেমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

নারীর চুল ও শরীর আবৃত রাখার বিধান এবং মুখ ও হাতের মতপার্থক্যপূর্ণ বিধান এক বিষয় নয়। মাথার চুল ঢেকে রাখা শরিয়তসম্মত হিজাবের প্রতিষ্ঠিত শর্ত; কিন্তু মুখ ঢাকার বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। একইভাবে পোশাকের আবরণ যথাযথ হলেও যদি কথাবার্তা, আচরণ বা সাজসজ্জায় ইচ্ছাকৃতভাবে অনুচিত আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়, তবে শুধু পোশাকের কারণে পর্দার সব উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। আবার কোনো নারী মুখ খোলা রাখেন বলেই তাঁর শালীনতা, তাকওয়া কিংবা সামগ্রিক ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

চলাফেরা ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনা ভারসাম্যপূর্ণ। নারী প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন, চিকিৎসা নিতে পারেন, বৈধ পেশায় কাজ করতে পারেন, কেনাবেচা ও সামাজিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে শালীন পোশাক, সংযত আচরণ, নিরাপত্তা এবং শরিয়তের সীমা রক্ষা করতে হবে। পরপুরুষের সঙ্গে একান্ত নির্জনে অবস্থান, অনুচিত ঘনিষ্ঠতা কিংবা এমন যোগাযোগ, যা হারাম সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায়, তা পরিহার করা জরুরি। তবে প্রয়োজনীয় ও শালীন কথাবার্তাকে নির্বিচারে নিষিদ্ধ বলা সঠিক নয়। পর্দা নারীর বৈধ জীবনযাত্রা বন্ধ করার বিধান নয়; বরং সেই জীবনযাত্রাকে নৈতিক ও ধর্মীয় সীমার মধ্যে পরিচালিত করার নির্দেশনা।

সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য এবং পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী ও মাহরামদের সামনে নারীর সাজসজ্জার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু পরপুরুষের সামনে এমনভাবে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, যাতে অনুচিত আকর্ষণ তৈরি হয়, তা পর্দার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। বাইরে যাওয়ার সময় পোশাক, অলংকার, সুগন্ধি ও সাজসজ্জা সম্পর্কে এমন সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে শালীনতা বজায় থাকে এবং সৌন্দর্য প্রদর্শনই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে না দাঁড়ায়। একই সঙ্গে পুরুষেরও দায়িত্ব হলো নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা এবং অনুচিত দৃষ্টি থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

পূর্ণাঙ্গ পর্দার আরেকটি অপরিহার্য দিক হলো নৈতিকতা। মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, অশালীন ভাষা, অহংকার কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই জরুরি। বাহ্যিক পোশাক ইসলামী পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তা একাই মানুষের সম্পূর্ণ নৈতিক অবস্থার প্রমাণ নয়। পর্দার সঙ্গে সততা, বিনয়, আমানতদারি, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি যুক্ত হলে তার প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।

পর্দার বিধান বাস্তবায়নের নামে কোনো নারীকে অপমান, হয়রানি কিংবা নির্যাতন করার সুযোগ নেই। ধর্মীয় দায়িত্ব বোঝানোর ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও সদাচরণ প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের উচিত পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, সঠিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা এবং পর্দার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। একইভাবে সমাজের দায়িত্ব হলো নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা। পর্দার আলোচনা যেন বিদ্বেষ, অপমান কিংবা পারস্পরিক দোষারোপের কারণ না হয়ে ওঠে।

সারকথা, নারীর পূর্ণাঙ্গ পর্দার মূল বিধান হলো শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখা, পোশাককে অস্বচ্ছ ও ঢিলেঢালা রাখা, সৌন্দর্য প্রকাশের সীমা মানা, কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখা, দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখা এবং অনুচিত ঘনিষ্ঠতা থেকে বিরত থাকা। নারীর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর নিজে নিজে সতর নয়; প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বৈধ, তবে প্রলুব্ধকর ভঙ্গি ও অশালীনতা পরিহার করতে হবে। মুখ ও হাত ঢাকার বিষয়ে স্বীকৃত ফিকহি মতপার্থক্য রয়েছে; তাই এ বিষয়ে দলিলভিত্তিক জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। পায়ের আবরণেও মতভেদ রয়েছে, যা যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইসলামের পর্দা এমন একটি জীবনদর্শন, যেখানে বাহ্যিক আবরণ ও অন্তরের পবিত্রতা পরস্পরের পরিপূরক। এর উদ্দেশ্য নারীকে হেয় করা নয়, পুরুষকে দায়িত্বমুক্ত করা নয়, কিংবা সমাজ থেকে নারীকে বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশনা মেনে একটি শালীন, নিরাপদ ও নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা। পর্দার বিধান বুঝতে হলে, আবেগের পরিবর্তে জ্ঞান, কঠোরতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা এবং মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে বিদ্বেষের পরিবর্তে ন্যায়সংগত আচরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর