রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— কে হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি? এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আগামী শনিবার (১ আগস্ট) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির একটি বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছে। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই বৈঠকের মূল এবং প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এমনকি ধারণা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, আগামী শনিবার নির্ধারিত সময়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বৈঠকের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার অভাব দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রপতির এই শূন্যতা তৈরি হওয়ার পর থেকেই নতুন প্রধান নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি প্রোফাইল ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে। সেখানে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে এই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেগম সেলিমা রহমান, নজরুল ইসলাম খান, ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এ ছাড়া দলীয় সূত্রের দাবি, নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং কয়েকজন প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন তৎপর হয়ে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে থাকে। এই লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল দলীয় আনুগত্য নয়, বরং প্রার্থীর সম্ভাব্য মেয়াদকাল, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষাগত ও কূটনৈতিক যোগ্যতা এবং প্রার্থীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার মতো একাধিক বিষয় গভীরভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন গুরুত্বারোপ করেছেন প্রার্থীর স্বচ্ছতার ওপর। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া উচিত যার ভাবমূর্তি নিষ্কলঙ্ক, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং যার রাষ্ট্রের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও দৃঢ় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা আছে। তার মতে, দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হলেও একজন অভিজ্ঞ ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।


















