যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হংকংয়ে চলে গেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর সময় এ যন্ত্রাংশগুলো হাতছাড়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ওয়াশিংটন। গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এই যুদ্ধবিমান ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ শেষ পর্যন্ত চীনের হাতে পৌঁছে গেল কি না। তবে মার্কিন বা অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু জানায়নি। চীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালানটি ঘুরিয়ে দিয়েছে বা প্রযুক্তিটি হাতিয়ে নিয়েছে কি না, সে বিষয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডাকসেবার এক কর্মকর্তার ভুলের কারণেই চালানটি হংকংয়ে পৌঁছায়। চীন নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমানের অংশ পাঠাতে নিষেধ করে পাঠানো একটি ইমেইল খেয়াল না করায় এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস জানিয়েছেন, চালানটিতে থাকা যন্ত্রাংশ খুব বেশি ‘সংবেদনশীল’ ছিল না। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানে না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো প্রথম জানায়, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশের একটি চালান অস্ট্রেলিয়া থেকে রওনা হওয়ার পর পথ বদলে হংকংয়ে চলে যায়। এই চালানে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ককপিট ক্যানোপি অর্থাৎ উপরের কাচের ঢাকনা এবং ওয়েপনস-বে ডোর অর্থাৎ অস্ত্র রাখার কক্ষের দরজা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পেন্টাগনের এফ-৩৫ জয়েন্ট প্রোগ্রাম অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ স্থানান্তরে ‘একটি সমস্যা’ তাদের নজরে এসেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যন্ত্রাংশগুলো ফেরত আনার চেষ্টা চলছে বলে তারা উল্লেখ করেছে।

এক বিবৃতিতে কার্যালয়টি জানায়, ‘আমরা মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি, যাতে যন্ত্রাংশগুলো উদ্ধার করা যায়, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসন এবং এফ-৩৫-এর মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তদন্তে সহায়তা করছে অস্ট্রেলিয়া। তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অংশে কী ঘটেছিল, তা আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছি। তবে চূড়ান্তভাবে কী ঘটেছে এবং এটি কীভাবে সমাধান করা হবে, তা ঠিক করবে যুক্তরাষ্ট্র ও লকহিড মার্টিন।’

অস্ট্রেলিয়ার কাছে বর্তমানে ৭২টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সাতটি দেশ বিশ্বব্যাপী এই বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশের যৌথ সুবিধা পেয়ে থাকে, যার অন্যতম অস্ট্রেলিয়া। দেশটির সিডনির উত্তরে অবস্থিত উইলিয়ামটাউন নৌঘাঁটির একটি গুদাম এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই যুদ্ধবিমানগুলোর যন্ত্রাংশ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

চালানটি কেন হংকংয়ে গেল?

চালানটি হংকংয়ে কেন পৌঁছেছিল, পেন্টাগন বা অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ কেউই তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করেনি। এ ছাড়া এই ঘটনার পেছনে চীন সরাসরি জড়িত, তারও কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ফার্মের পাঠানো বার্তা ইউপিএস কুরিয়ার সার্ভিসের এক কর্মী মিস করায় ঘটনাটি ঘটে। মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সুরক্ষায় ট্রানজিটের জন্য নিষিদ্ধ করা দেশের তালিকায় হংকং অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ইমেইলে উল্লেখ করা হলেও ডাককর্মী সেটি সময়মতো গুরুত্ব দেননি।

লকহিড মার্টিন আন্তর্জাতিকভাবে যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা সরবরাহ করলেও ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো কর্মসূচির লাগাম মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে থাকে। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, উইলিয়ামটাউন গুদাম থেকে এফ-৩৫ যন্ত্রাংশ রপ্তানির বিষয়ে ক্যানবেরা সরাসরি কোনো নির্দেশনা দেয় না। আল জাজিরার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটোপুলোস জানান, এই বৈশ্বিক কর্মসূচির জটিল কাঠামোর কারণেই রসদ সরবরাহে এমন জটিলতা দেখা দেয়। তিনি বলেন, ‘এফ-৩৫ মার্কিন বিমান হলেও এর বিভিন্ন অংশ ১১টি ভিন্ন দেশের সাব-কন্টাক্টররা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের ১৩টি দেশ এফ-৩৫ বিমান ব্যবহার করছে। ফলে প্রতিটি বিমানবাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থা বিশাল ও জটিল।’

নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্দিষ্ট শিপিং প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে লকহিড মার্টিন অস্ট্রেলিয়া। তবে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, প্রতিটি চালান অত্যন্ত গুরুত্ব ও মার্কিন আইন মেনে স্থানান্তর করা হয়।

ঘটনাটি কতটা উদ্বেগজনক?

পেন্টাগন যেভাবে যন্ত্রাংশগুলো উদ্ধারে তাৎক্ষণিক তদন্তে নেমেছে, তাতে স্পষ্ট যে ঘটনাটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি অনেকটা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো গোপনীয় বা অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ নিয়ে কথা বলছি না।’

ঘটনাটি ঘিরে মূল উদ্বেগের কারণ হলো এফ-৩৫-এর বৈশিষ্ট্য। এটি পঞ্চম প্রজন্মের অত্যন্ত শক্তিশালী স্টেলথ ফাইটার, যাতে রাডার ফাঁকি দেওয়ার বিশেষ কোটিং, সর্বাধুনিক রাডার, সেন্সর ও নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি রয়েছে। মার্কিন ইউএস কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস অনুসারে, এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০টিরও বেশি এমন বিমান তৈরি হয়েছে এবং ১৯টি দেশ এর অর্ডার দিয়েছে।

চীনের বিরুদ্ধে এর আগেও এই কর্মসূচির তথ্য চুরির অভিযোগ উঠেছিল। ২০১৩ সালে প্রকাশিত মার্কিন ডিফেন্স সায়েন্স বোর্ডের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, চীনা সাইবার হামলার শিকার হয়ে পেন্টাগনের বেশ কয়েকটি কর্মসূচির তথ্য চুরি হয়, যার মধ্যে জয়েন্ট স্ট্রাইক ফাইটার প্রোগ্রামও ছিল। কয়েক বছর ধরে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই ধরনের গোয়েন্দা তৎপরতা ও সাইবার হামলার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এমনকি সরকারি গোপন নথি ও ব্যবসায়িক ডেটা চুরির অভিযোগে বেইজিংয়ের গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই মার্কিন নৌবাহিনীর এক সাবেক নাবিককে ১৬ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চীনের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও নৌ-প্রযুক্তির নির্দেশিকা বিক্রি করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি।