বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমানে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলছে। বাস ও ট্রেনে অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিরোধী শিবিরের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি বিশেষ আলোচনা সভায় তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। রিজভী বলেন, ‘কারা এসব ঘটাচ্ছে? এরা কারা? এরা আসলে সব পতিত স্বৈরাচার। এরপরও আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসীদের বক্তব্য আসছে।

বিরোধী দলের মধ্য থেকেই এসব হুমকি আসছে।’ তিনি রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘গত রোববার রাতে গুপ্ত বলে পরিচিত সংগঠনের ছাত্র সংগঠনটি রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। সেখানে তারা ভাঙচুর ও অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসের দায় কে নেবে? আপনারা যদি সত্যিই জনগণের পক্ষে থাকেন, তবে এই পরিকল্পিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি লং মার্চ করে দেখান।’ জামায়াত-ই-ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রিজভী বলেন, ‘আপনারা মূলত দুটি নীতি গ্রহণ করেছেন। একটি হলো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিরোধী বক্তব্য প্রদান করা, আর অন্যটি হলো আপনাদের নিজেদের সোনালি বা রুপালি রঙের ছেলেদের উসকে দিয়ে দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো। আপনারা মূলত দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক অগ্রগতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান আন্দোলনের সময় যখন এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তখনও আপনারা সেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের সকল স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে আপনারা বাধা দিয়েছেন। জনগণের পক্ষে আপনাদের কোনো ভূমিকা কখনোই ছিল না।

কিন্তু আপনারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনগণকে বারবার প্রতারণা করেছেন, যার ফলে কোনো দিনই আপনারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেননি।’ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, একটি ন্যায্য ও সঠিক সরকারি কার্যক্রমকে অপপ্রচারের ঘেরাটোপ দিয়ে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে কেউ বলতে পারবে না যে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হচ্ছে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লুটপাট হচ্ছে। বরং আমাদের আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং কার্যক্রম পুনরায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কিছু রাজনৈতিক দলের সুর আজ একটু ভিন্নভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুর্নীতির প্রতিবাদসহ জনস্বার্থে কয়েকটি দাবি নিয়ে আপনারা চট্টগ্রাম ও রংপুরে লং মার্চ করছেন, এতে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু জনগণের প্রতি যদি আপনাদের প্রকৃত দায়বদ্ধতা থাকে, তবে রংপুরে আপনাদের শক্তিশালী সংগঠন থাকা সত্ত্বেও কেন ৪৫০টি গাড়ি নিয়ে গেলেন?’ জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের এই কঠিন সময়ে ৪৫০টি গাড়িতে জ্বালানি পুড়তে দিলেন কেন? ওই জ্বালানি অপচয় না হলে দেশের অনেক সাশ্রয় হতো। আজ আমাদের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেই জ্বালানি আরও ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কোনো কিছু বানিয়ে বলছি না। এটি যমুনা সেতুর টোলের হিসাব অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে ৪৫০টি গাড়ি সেখানে গিয়েছে। অথচ আপনাদের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে আপনারা এক হাজার গাড়ি নিয়েছেন। তাহলে কিছু গাড়ির টোলের ক্ষেত্রেও হয়তো অনিয়ম হয়েছে।’ বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রিজভী বলেন, ‘এই সংকটের সঙ্গে সরকার, বিরোধী দল কিংবা দেশের সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই। এই সংকটটি মূলত বৈশ্বিক এবং তা বাংলাদেশের অনেক দূরে। অথচ আপনারা সরাসরি সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন।’

তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো আপত্তি নেই। গণতন্ত্রের স্বার্থে আপনারা সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে কথা বলতে পারেন, জোরালো সমালোচনা করতে পারেন। আপনারা লং মার্চ করেছেন, কিন্তু সরকার বা সরকারের পক্ষের দল কোথাও বিন্দুমাত্র বাধা দেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শেখ হাসিনার অসভ্যতা, কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু এখন আবারও সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখছি। এর জন্যই কি আবু সাঈদসহ এত মানুষের আত্মদান?’ শেষ পর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস টেনে বলেন, ‘এই স্বাধীন দেশেই এমন একটি রাজনৈতিক দল ছিল, যারা পাঞ্জাবি, বালুচ, ব্রিটিশ বা স্কটিশ নয়, তারাই আমাদের ওপর এ ধরনের বর্বর আচরণ করেছে। এই গোষ্ঠী অতীতে আমাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে। কিন্তু শেখ হাসিনার নিপীড়ন আমার কাছে কোনো কোনো সময় তাদের চেয়েও বেশি ও ভয়াবহ মনে হয়েছে।’