অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে তীব্র ও বিস্ফোরক সমালোচনা করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি আসিফ নজরুলের চরিত্রের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা খন্দকার মোশতাক আহমেদের তুলনা টেনে আনেন।

সাক্ষাৎকারে ফজলুর রহমান জানান, একসময় ড. আসিফ নজরুলের সম্পর্কে তার অত্যন্ত ইতিবাচক ধারণা ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করতাম, এই লোকটা জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর। এখানে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি হয়ে গেলেন। আমি তাকে খুব রেসপেক্ট করতাম। আমাদের মিটিংয়ে যখন তিনি কথা বলতেন, মনে হতো যেন একজন ফেরেশতা কথা বলছেন।’ তবে সময়ের সাথে সাথে আসিফ নজরুলের ভূমিকা এবং কর্মকাণ্ড দেখে তার এই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায় বলে জানান তিনি।

আসিফ নজরুলের চরিত্রের রহস্য খুঁজতে গিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘এই লোকটার বাড়ি কুমিল্লা। এত শিক্ষিত মানুষ হয়েও তার চরিত্র কেন এমন, আমি তা মিলায়ে দেখি। এই লোকটার কুমিল্লার পাশের বাড়ির আরেকজন লোক আছে দাউদকান্দির, যার নাম খন্দকার মোশতাক। আমার কাছে মনে হয়, খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে তার কোনো আত্মীয়তা আছে।’ খন্দকার মোশতাকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর বাবা যখন মারা গেছেন, তার চেয়ে বেশি কেউ কেঁদেছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হত্যাটা সেই করেছে।’ আসিফ নজরুলের বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, ‘আসিফ নজরুলের ক্যারেক্টারটা আমার কাছে ঠিক তেমনই মনে হয়। কাজেই আপনি যাদের খুব শিক্ষিত এবং ভালো মানুষ মনে করছেন, তাদের অন্তরে যে বাংলাদেশ রাখা যাবে না, এই দেশটাকে প্রগতির পথে বা মুক্তির পথে রাখা যাবে না—তা তারা ১৮ মাসের শাসনে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’

সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও তীব্র আক্রমণ করেন ফজলুর রহমান। একসময় নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদকে নিয়ে তার মনে গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি বলেন, ‘বাঙালির মুসলমান সন্তান কোনোদিন নোবেল পায়নি, তার চেয়ে গৌরবের আর কিছু হতে পারে না।’ তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং নীরবতা দেখে তার অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। তার অভিযোগ, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হলেও ড. ইউনূস তার প্রতিবাদ করেননি।

ফজলুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেদিন থেকে আমি এসব দেখতে শুরু করলাম এবং ফাইনালি যখন দেখলাম জামায়াত ও ছাত্রশিবির বলা শুরু করল যে এই দেশে কোনো যুদ্ধ হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু ছিল না, বরং হয়েছিল একটা গণ্ডগোল—আর সেই গণ্ডগোলটা লাগিয়ে দিয়েছিল আমাদের মহাশত্রু হিন্দুস্তান, এই কারণে এটা কোনো যুদ্ধ হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইউনূস সাহেবকে বলছিলাম, আপনি যেহেতু এটার প্রতিবাদ করেননি, তাই আপনি হলেন এটার প্রধান উৎসাহদাতা অথবা প্রধান কারিগর।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থানে ড. ইউনূসের অনুপস্থিতির বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি। ফজলুর রহমান বলেন, ‘আপনি এক দিনও শহীদ মিনারে যান নাই, এক দিনও স্মৃতিস্তম্ভে যান নাই। এমনকি আপনার পরিবারে একজন লোকও মুক্তিযুদ্ধে যান নাই।’ এই পাশাপাশি তিনি ড. ইউনূসের পারিবারিক ব্যবসা এবং গ্রামীণ ব্যবসা নিয়েও সমালোচনা করেন।

সচিবালয়কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়মের কথা জানান ফজলুর রহমান। তিনি তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘সচিবালয়ে বসে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সরকার তা ধরে না কেন, আমি বুঝি না। একবার শুধু বলা হয়েছে যে পার্লামেন্টে এটার বিচার হবে। আমি জানি না কথা এবং কাজ এক হবে কি না।’

সবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল সম্পর্কে মূল্যায়ন করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘ইউনূস সাহেব নেতা ছিলেন। যার আমলে এত কিছু হতে পারে, সে ইউনূস সাহেব যত কথাই বলেন না কেন, আমি মনে করি তিনি নোবেল লরিয়েট এবং আমার মুরব্বি হিসেবে উনার প্রতি শ্রদ্ধা রইল। কিন্তু শাসক হিসেবে তিনি একজন দুঃশাসক এবং বাংলাদেশের জন্য চরম সর্বনাশ করে রেখে গেছেন।’